স্থান: কলকাতা তারিখ: ১৭ জুলাই, ২০২৬
কলকাতা, ১৭ জুলাই:বাজারে বর্তমানে সোনা ও রুপোর দাম যেভাবে রেকর্ড ছাড়িয়ে আকাশ স্পর্শ করছে, তাতে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে পেশাদার বিনিয়োগকারী—সবার কপালেই চিন্তার ভাঁজ। কিন্তু এই অগ্নিমূল্যের বাজারেও বিনিয়োগকারীদের জন্য এক চমৎকার বিকল্প আর্থিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। যখন ভারতীয় শেয়ার বাজার বা নিফটি ক্রমাগত ওঠানামার গোলকধাঁধায় আটকে থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলছে, ঠিক তখনই বাজারের আড়ালে থাকা কিছু নির্দিষ্ট মিউচুয়াল ফান্ড বিভাগ নিঃশব্দে নজরকাড়া পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে পোর্টফোলিওতে বড়সড় সম্পদ তৈরির আসল ‘সোনার খনি’ লুকিয়ে রয়েছে এই ফান্ডগুলির মধ্যেই।
গত কয়েক বছরে প্রথাগত ও বহুল প্রচলিত লার্জ ক্যাপ বা সাধারণ ইকুইটি ফান্ডের তুলনায় সোনা (Gold Fund), রুপো (Silver Fund), আন্তর্জাতিক ইকুইটি, কমোডিটি এবং নির্দিষ্ট কিছু থিম্যাটিক ও সেক্টরাল ফান্ড বহুগুণ বেশি রিটার্ন দিয়েছে। দেশীয় মূল বাজার যখন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্থবির হয়ে ঘুরেছে, তখন এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্পদশ্রেণিগুলির (Asset Classes) ধারাবাহিক উত্থান অনেক বিনিয়োগকারীকে দারুণ মুনাফা দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—সোনার এই অগ্নিমূল্য বাজারে সরাসরি ধাতু কেনা লাভজনক, নাকি এই মিউচুয়াল ফান্ডগুলিতে নতুন করে বিনিয়োগের ট্রেন্ডে পা দেওয়ার সময় এখনও রয়েছে?
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলা প্রয়োজন। কোনও নির্দিষ্ট ফান্ড বিভাগ গত এক বা দুই বছরে দুর্দান্ত রিটার্ন দিয়েছে মানেই আগামী দিনেও যে তা একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, এমন ভাবা ভুল। বাজারচক্রের পরিবর্তনের সাথে সাথে আজকের সবথেকে জনপ্রিয় ‘হট’ ফান্ডটিই আগামীতে কঠিন চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই হুজুগে পড়ে একক কোনও ফান্ডে সমস্ত পুঁজি ঢেলে দেওয়ার চেয়ে পোর্টফোলিওতে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে বড় সম্পদ তৈরির প্রধান উপায় হল—সোনা, আন্তর্জাতিক ইকুইটি এবং কমোডিটি ফান্ডের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজের বিনিয়োগকে ভাগ করে দেওয়া।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রধান পরামর্শ হল :
• হুজুগে বিনিয়োগ নয়: শুধুমাত্র অতীতের রিটার্নের তালিকা দেখে বা চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে কোনও ফান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না।
• পোর্টফোলিও ডাইভার্সিফিকেশন: সামগ্রিক পোর্টফোলিও সুরক্ষিত রাখতে মূলধনের একটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত অংশ সোনা এবং আন্তর্জাতিক ফান্ডে রাখা উচিত।
• ঝুঁকি ও লক্ষ্যের সামঞ্জস্য: যে কোনও ফান্ডে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের বৃদ্ধির কারণ, বাজার মূল্যায়ন (Valuation) এবং নিজের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সাথে তার সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে একক কোনও ম্যাজিক ফান্ড বা রাতারাতি ধনী হওয়ার মতো ‘সোনার খনি’ বলে কিছু হয় না। সঠিক সময়ে, সঠিক সম্পদশ্রেণিতে সুপরিকল্পিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্বাধীনতা ও সম্পদ অর্জনের আসল চাবিকাঠি।
এ বিষয়ে আলোচনা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানে
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়েই সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহীদ্য পার্কহোটেলে আয়োজিত হয়েছিল একটি বিশেষ ‘বিনিয়োগকারী সচেতনতা’অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেঅঞ্জলি ইনভেস্টমেন্টস। সহযোগিতায় ছিল HDFC Mutual Fund, ICICI Prudential Mutual Fund, Bandhan Mutual Fund, WhiteOak Capital Mutual Fund, Aditya Birla Sun Life Mutual Fund এবং Kotak Mutual Fund।
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা বাজারের অস্থিরতার সময় আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর জোর দেন। তাঁদের মতে, নিয়মিত SIP চালিয়ে যাওয়া, সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন বজায় রাখা এবং স্বল্পমেয়াদি বাজার ওঠানামাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে অবিচল থাকাই সফল বিনিয়োগের মূল চাবিকাঠি।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য রাখতে গিয়েঅঞ্জলি ইনভেস্টমেন্টস-এর সিইও সজল রায়বলেন, “অঞ্জলি ইনভেস্টমেন্টসের ভূমিকা কখনওই শুধু বিভিন্ন আর্থিক পণ্য বা মিউচুয়াল ফান্ডের সুপারিশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের লক্ষ্য হল, বাজারে যখন নানা খবর, বৈশ্বিক অস্থিরতা বা সাময়িক ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে না দেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র বর্তমান বাজার পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বরং স্বল্পমেয়াদি বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের শোরগোল থেকে প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি সুযোগকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারাই একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই পথেই বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকা, তাঁদের সঠিক দিশা দেখানো এবং প্রতিটি বিনিয়োগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করাই অঞ্জলি ইনভেস্টমেন্টসের মূল অঙ্গীকার।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বন্ধন এএমসির প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ও স্ট্রাটেজি হেড শীর্ষেন্দু বসু বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে পোর্টফোলিওয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডাইভারসিফিকেশন জরুরি। তবে পোর্টফোলিও থেকে কত শতাংশ রিটার্ন পাবেন তা কোন সময় মার্কেটে বিনিয়োগ করলেন বা টাকা তুলে নিলেন তার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং কতদিন ধরে মার্কেটে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে চলেছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কেউ আগাম বলতে পারব না আগামী বছর কোন সেক্টর দারুণ ভাল করবে। তাই সোনা, ডোমেস্টিক ইকুইটি, ইন্টারন্যারশনাল ইকুইটি, ফিক্সড ইনকামের মতো সেক্টরগুলিতে বুঝে শুনে সম্পদ বণ্টন করে রাখতে হবে।
