· প্রচলিত বড় অস্ত্রোপচার না করেই চিকিৎসা ও সাফল্য
· মাত্র ৩ দিনে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন রোগী
হাওড়া, ১২ অগাস্ট: নারায়ণা হাসপাতাল, হাওড়া পূর্ব ভারতে প্রথমবার রোবোটিক সাইটোরিডাক্টিভ সার্জারি (CRS) এবং এর সঙ্গে হাইপারথার্মিক ইন্ট্রাপেরিটোনিয়াল কেমোথেরাপি (HIPEC) করেছে। এটি একটি দুই ধাপের চিকিৎসা-পদ্ধতি। প্রথমে শরীরে দেখা যাচ্ছে এমন ক্যান্সার কোষ ও টিউমার সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর পেটের ভিতরের অংশে উত্তপ্ত কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায়নি এমন ক্ষুদ্র ক্যান্সার কোষও ধ্বংস করা যায়।
অ্যাডভান্সড ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত ৪২ বছরের ওই মহিলাকে অস্ত্রোপচারের মাত্র তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় করে পেট কেটে এই অস্ত্রোপচার করলে সাধারণত সুস্থ হতে অনেক বেশি সময় লাগে। চিকিৎসার পর ওই মহিলা আবার কাজে ফিরেছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

আগে কোনও বড় শারীরিক অসুস্থতা ছিলো না ওই মহিলার । উনি প্রথমে পেট ফুলে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর পেটের ভিতরে অনেকটা জল জমেছে, দুই ডিম্বাশয়েই টিউমার রয়েছে এবং ক্যান্সার পেটের ভিতরের অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। বায়োপসি পরীক্ষায় স্টেজ IIIC ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে। এটি এমন অ্যাডভান্সড পর্যায়, যে ক্যান্সার শরীরের ভিতরে অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে।
রোগের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড প্রথমে অস্ত্রোপচার না করে কেমোথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দেয়। তাঁকে তিন দফা কেমোথেরাপি এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক জৈবিক ওষুধ দেওয়া হয়।
রোগী চিকিৎসায় তিনি ভালো সাড়া দেন। CA125, অর্থাৎ রোগীর ওভারিতে ক্যান্সারের কার্যকলাপ বোঝার জন্য চিকিৎসকেরা যে প্রোটিনের মাত্রা পরীক্ষা করেন, তা ১,১৫৮ থেকে কমে ১০.৩ হয়। স্ক্যানেও দেখা যায়, টিউমার ছোট হয়েছে এবং পেটের ভিতরে জমে থাকা জলও কমে গেছে।
কেমোথেরাপির এই ভালো ফলের কারণে অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনাও বদলে যায়। শরীরে অবশিষ্ট ক্যান্সারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এবং টিউমারের আকার ৮ সেন্টিমিটারের কম হওয়ায় টিউমার বোর্ড বড় করে অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে রোবোটিক CRS করার সিদ্ধান্ত নেয়।
রোবোটিক পদ্ধতিতে একই ধরনের ক্যান্সার অপসারণের অস্ত্রোপচার করা হয়, তবে পেটে একটি বড় কাটার পরিবর্তে ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে। এর ফলে রক্তক্ষরণ কম হয়, সংক্রমণের ঝুঁকি কমে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

রোবোটিক অস্ত্রোপচারটি প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে চলে। চিকিৎসকেরা শরীরে দেখা যাচ্ছে এমন সমস্ত ক্যান্সার সফলভাবে সরিয়ে ফেলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে “সম্পূর্ণ সাইটোরিডাকশন” বলা হয়, অর্থাৎ অস্ত্রোপচারের শেষে দৃশ্যমান কোনও ক্যান্সার অবশিষ্ট ছিল না।
এর পরেই অস্ত্রোপচারের দল HIPEC চিকিৎসা করে। এই পদ্ধতিতে সিসপ্লাটিন নামের উত্তপ্ত কেমোথেরাপির ওষুধ ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৯০ মিনিট ধরে পেটের ভিতর প্রয়োগ করা হয়। এর উদ্দেশ্য হল অস্ত্রোপচারের পর শরীরে থেকে যেতে পারে এমন অতি ক্ষুদ্র ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।
ওই মহিলা পরবর্তী কেমোথেরাপি সম্পূর্ণ করেছেন। বর্তমানে ক্যান্সার আবার ফিরে আসার ঝুঁকি কমানোর জন্য তাঁকে পরিকল্পিত মেইনটেন্যান্স থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে “PARP inhibitor”, এমন একটি ওষুধ যা ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ডা. কৌস্তভ বসু, ক্লিনিক্যাল লিড ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, গাইনেকোলজিক্যাল অঙ্কোলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, হাওড়া, বলেন: “পেটের ভিতরে ছড়িয়ে পড়া উন্নত পর্যায়ের ওভারিয়ান ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এতদিন সাধারণত বড় করে পেট কেটে অস্ত্রোপচার করতে হতো। এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রোগটি অনেকটা ছড়িয়ে পড়লেও কেমোথেরাপিতে রোগী ভালো সাড়া দিয়েছেন এবং শরীরে অবশিষ্ট ক্যান্সারের পরিমাণ কম ছিল। তাই আমরা নিরাপদে রোবোটিক পদ্ধতি বেছে নিতে পেরেছি। একই সময়ে রোবোটিক CRS ও HIPEC করার ফলে দৃশ্যমান ক্যান্সার সরানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র অবশিষ্ট ক্যানসার কোষেরও চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছে। বড় করে পেট কাটার কারণে যে দীর্ঘ সময় সুস্থ হতে লাগত, তা এড়ানো গেছে।”
ডা. সুমন মল্লিক, ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, রেডিয়েশন ক্যান্সারের, নারায়ণা হাসপাতাল, হাওড়া, বলেন: “রোবোটিক CRS-এর সঙ্গে HIPEC যুক্ত হওয়া ওভারিয়ান ক্যান্সারের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে কম ইনভেসিভ পদ্ধতিতে কার্যকরভাবে ক্যান্সার সরানো সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায় এবং চিকিৎসার ফলও বজায় থাকে।”
ডা. মানস খান, সিনিয়র কনসালট্যান্ট,অ্যানেস্থেসিওলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, হাওড়া, বলেন: “এই চিকিৎসা দেখিয়ে দিয়েছে যে উন্নত পর্যায়ের ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী যদি সামগ্রিকভাবে সুস্থ থাকেন এবং শরীরে ক্যান্সারের পরিমাণ কম থাকে, তাহলে নিরাপদে রোবোটিক CRS-এর সঙ্গে HIPEC করা সম্ভব। এর ফলে পূর্ব ভারতে কম ইনভেসিভ চিকিৎসার সুযোগ আরও বাড়ল।”
শ্রী অজিত কুমার বেল্লামকোন্ডা, ফ্যাসিলিটি ডিরেক্টর, নারায়ণা হাসপাতাল, হাওড়া ও চুনাভাটি, বলেন: “মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের মাধ্যমে সঠিক রোগী বেছে নেওয়াই রোবোটিক CRS ও HIPEC-এর মতো উন্নত চিকিৎসা নিরাপদে করার মূল চাবিকাঠি। পূর্বাঞ্চলের রোগীদের জন্য আমাদের টীম এখন এই ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসা দিতে পারছে । এটি আমাদের গর্বের বিষয়। এই সাফল্য আমাদের উন্নত চিকিৎসা-প্রোটোকল এবং পূর্ব ভারতে কম ইনভেসিভ ক্যান্সার চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে।”

উপযুক্তভাবে বেছে নেওয়া উন্নত পর্যায়ের ওভারিয়ান ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে CRS-এর সঙ্গে HIPEC করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। প্রকাশিত গবেষণায় এই চিকিৎসার পর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতদিন এই চিকিৎসার জন্য সাধারণত পেটে বড় করে কাটতে হতো। ফলে অস্ত্রোপচার জটিল হয়ে উঠত এবং রোগীর সুস্থ হতে বেশি সময় লাগত। রোবোটিক পদ্ধতিতে বড় কাটাছেঁড়া ছাড়াই একই ধরনের ক্যান্সার অপসারণ করা যায়।
এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে ক্যান্সার অনেকটা ছড়িয়ে পড়লেও, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে এবং শরীরে ক্যান্সারের পরিমাণ কম থাকলে, যেমন টিউমারের আকার ৮ সেন্টিমিটারের কম হলে, নির্বাচিত রোগীদের এই কম ইনভেসিভ চিকিৎসা নিরাপদে দেওয়া সম্ভব, এবং চিকিৎসার ফলের সঙ্গে আপস করতে হয় না।
