মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ৪২ বছরের রোগীর সফল অস্ত্রোপচার মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ায়

Published:

কলকাতা, ১২ অক্টোবর ২০২৬: মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কের প্রাণঘাতী রক্তক্ষরণে আক্রান্ত বিহারের ৪২ বছর বয়সি কৃষক রমেশ কুমারের (নাম পরিবর্তিত) সফল চিকিৎসা করেছেন। মস্তিষ্কের সামনের দিকে রক্ত সরবরাহকারী দুটি প্রধান ধমনিকে যুক্ত করা রক্তনালির দেওয়ালে দুর্বল অংশ তৈরি হয়ে বেলুনের মতো ফুলে উঠেছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে অ্যানিউরিজম (Aneurysm) বলা হয়। সেই অংশটি ফেটে যাওয়ায় তাঁর মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণ হয়। হাসপাতালে আনার সময় রোগীর প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বারবার বমি এবং ঝিমুনির মতো উপসর্গ দেখা গিয়েছিল। বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে অ্যানিউরিজমের কারণে হওয়া সাবঅ্যারাকনয়েড হেমারেজ (SAH) বলা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুত্ব এবং পুনরায় রক্তক্ষরণের উচ্চ ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে, নিউরোসার্জারি বিভাগের, ডা. নিরুপ দত্ত, কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার নেতৃত্বে, চিকিৎসক দল দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।

অনেক সময় মস্তিষ্কের রক্তনালিতে এমন দুর্বল অংশ বছরের পর বছর কোনও লক্ষণ ছাড়াই থেকে যেতে পারে। সিটি স্ক্যানে মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণের বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর ডিজিটাল সাবট্র্যাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি (DSA) নামে একটি বিশেষ পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলির বিস্তারিত ছবি পাওয়া যায়। পরীক্ষায় মস্তিষ্কের সামনের দিকে দুটি প্রধান ধমনিকে যুক্ত করা রক্তনালিতে প্রায় ৮.৯ × ৩ মিলিমিটার মাপের একটি জটিল অ্যানিউরিজম ধরা পড়ে। এর মুখও ছিল তুলনামূলকভাবে চওড়া। পাশাপাশি, ওই অঞ্চলে রক্ত সরবরাহকারী বাম দিকের A1 রক্তনালিটি স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট ছিল। ফলে অস্ত্রোপচারটি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসকদের অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হয়।

মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম হল রক্তনালির দেওয়ালে তৈরি হওয়া দুর্বল, বেলুনের মতো ফুলে ওঠা একটি অংশ। এটি ফেটে না যাওয়া পর্যন্ত অনেক সময় কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু একবার ফেটে গেলে মস্তিষ্কের চারপাশে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। প্রথমবার রক্তক্ষরণের পরের ৪৮ থেকে ৯৬ ঘণ্টায় আবার রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বিশেষভাবে বেশি থাকে। দ্বিতীয়বার রক্তক্ষরণ হলে মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। চিকিৎসকের মতে, দ্বিতীয়বার রক্তক্ষরণ হলে প্রায় ৫০-৭০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হতে পারে। তাই অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ভ্যাসোস্প্যাজম (Vasospasm) বলা হয়। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কমে যেতে পারে এবং স্ট্রোকের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

ফেটে যাওয়া অ্যানিউরিজমটি বন্ধ করে ফের রক্তক্ষরণ আটকাতে চিকিৎসকেরা মাইক্রোসার্জিক্যাল ক্লিপিং নামে একটি বিশেষ অস্ত্রোপচার করেন। এর জন্য প্রথমে রোগীর মাথার খুলির বাম দিকে একটি ছোট অংশ খুলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত জায়গায় পৌঁছনো হয়। এই পদ্ধতিকে লেফট প্টেরিওনাল ব্র্যানিওটমি (Left Pterional Craniotomy) বলা হয়। এরপর অ্যানিউরিজমের দুর্বল অংশটি চিহ্নিত করে সেখানে একটি বিশেষ ক্লিপ বসানো হয়, যাতে ওই অংশে আর রক্ত প্রবেশ করতে না পারে এবং ফের রক্তক্ষরণ না হয়। মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজমের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্লিপ বসানো এবং রক্তনালির ভিতর দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে কয়েল ব্যবহার করা-দুটি পদ্ধতিই প্রচলিত। তবে কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হবে, তা রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং অ্যানিউরিজমের আকার, অবস্থান ও গঠনের উপর নির্ভর করে। এই ক্ষেত্রে অ্যানিউরিজমের ধরন ও রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্লিপ বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে অ্যানিউরিজমটির অবস্থান এবং তার জটিল গঠনের কারণে অস্ত্রোপচারের সময় বিশেষ সতর্কতা ও নিখুঁত দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে আইসিইউ বা এইচডিইউতে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। নিয়মিত স্নায়বিক পরীক্ষা এবং একাধিকবার স্ক্যানও করা হয়। অস্ত্রোপচারের পরের স্ক্যানে মস্তিষ্কে কিছুটা রক্তক্ষরণ ও ফোলাভাবের পাশাপাশি স্ট্রোকের একটি ছোট অংশ এবং মস্তিষ্কের আবরণের নীচে রক্ত জমে থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে যথাযথ চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ফলে ধীরে ধীরে রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। পরে তিনি নিজে হাঁটাচলা করার মতো অবস্থায় পৌঁছন।

এই বিষয়ে ডা. নিরুপ দত্ত, কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া বলেন, “মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুতর ও জীবনসংশয়ী পরিস্থিতি, যেখানে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার রক্তক্ষরণের পরের ৪৮ থেকে ৯৬ ঘণ্টায় ফের রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বিশেষভাবে বেশি থাকে। দ্বিতীয়বার রক্তক্ষরণ হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই রোগীর ক্ষেত্রে অ্যানিউরিজমটির গঠন ছিল জটিল। এর মুখ ছিল চওড়া এবং বাম দিকের A1 রক্তনালিটি স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট ছিল। ফলে অস্ত্রোপচারটি প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কঠিন ছিল। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব অ্যানিউরিজমটি বন্ধ করা এবং ফের রক্তক্ষরণ আটকানো। সতর্কতার সঙ্গে মাইক্রোসার্জিক্যাল ক্লিপিং, অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং যথাযথ চিকিৎসার ফলে রোগীর গুরুতর অবস্থা সত্ত্বেও তিনি ভালোভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি, অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়ার সতর্কতামূলক লক্ষণগুলি চিনে নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। হঠাৎ শুরু হওয়া অসহ্য মাথাব্যথা, যাকে অনেক সময় ‘থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক’ বলা হয়, বিশেষ করে তার সঙ্গে বমি, জ্ঞান হারানো বা খিঁচুনি হলে বিষয়টিকে কোনওভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা ফের রক্তক্ষরণ এবং মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।”

জটিল ও ফেটে যাওয়া মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজমের সফল চিকিৎসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে যে, দ্রুত রোগ নির্ণয়, সময়মতো অস্ত্রোপচার, বিশেষজ্ঞ নিউরোসার্জারি পরিষেবা এবং অস্ত্রোপচারের পর যথাযথ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ, জীবনসংশয়ী স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

About Manipal Hospitals: Manipal Hospitals is one of India’s leading integrated healthcare providers serving 8 million patients annually, focussed on providing accessible, high-quality healthcare services. Manipal’s integrated network today has a pan-India footprint of 50 hospitals with over 13,400 licensed beds across 14 States & Union Territories. The network is India’s largest multispecialty hospital network by bed capacity, supported by a talented pool of 11,000+doctors and an employee strength of over 25,000. With a commitment to provide patient-centric care, Manipal Hospitals combines clinical expertise with advanced technology, research and innovation to serve a multitude of patients across the globe. Its continued focus on clinical quality and operational excellence is reflected in its NABH accreditation, with several of its hospitals also accredited by NABL and recognised for its excellence in nursing and emergency care.

Related articles

Recent articles